খুলনা বিআরটিএ যেন দুর্নীতির আঁতুড়ঘর! ঘুষ ছাড়া মিলছে না সেবা, অভিযোগ ভুক্তভোগীদের

খুলনা বিআরটিএ যেন দুর্নীতির আঁতুড়ঘর! ঘুষ ছাড়া মিলছে না সেবা, অভিযোগ ভুক্তভোগীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক, ধারাবাহিকের ১ম পর্ব: 

সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হলো চালকদের অদক্ষতা, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনিয়ম ও দুর্বল তদারকি।

এদিকে খুলনা বিআরটিএ কার্যালয়কে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ করে আসছেন সেবা প্রত্যাশীরা। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ অর্থের বিনিময়ে অদক্ষ চালকরাও সহজেই ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছেন।

লাইসেন্স প্রত্যাশী একাধিক ব্যক্তি জানান, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে একাধিকবার পরীক্ষা দিয়েও তারা উত্তীর্ণ হতে পারেননি। অথচ তাদের পরিচিত অনেকেই মাঠ পর্যায়ে গাড়ি চালনায় দক্ষতা প্রদর্শন করতে না পারলেও জনপ্রতি প্রায় ৩ হাজার টাকার বিনিময়ে পরীক্ষায় পাস করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, অবৈধভাবে পাস করতে হলে পরীক্ষা শুরুর আগেই নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়।

শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্স নয়, যানবাহনের ফিটনেস সনদ গ্রহণের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। বাস, ট্রাক, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের মালিকরা জানান, সরকারি নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার পরও ‘সেকশন ফি’ নামে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে কাগজপত্রে নানা ধরনের ত্রুটি ও গাড়ির বিভিন্ন সমস্যা দেখিয়ে হয়রানি করা হয়। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে ঘুষ দিতে হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ফিটনেস সনদ নবায়নের জন্য আসা অনেক যানবাহন সরেজমিনে পরিদর্শন না করেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বহিরাগতদের সরবরাহ করা ছবির ভিত্তিতে ফিটনেস সনদে স্বাক্ষর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঘুষের অর্থ লেনদেনের জন্য বিভিন্ন শাখায় কর্মকর্তাদের কক্ষের ভেতরে আলাদা টেবিলে বসে কম্পিউটারে কাজ করেন কিছু ব্যক্তি, যারা বিআরটিএর নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী নন। তারাই বিভিন্ন লেনদেনের হিসাব-নিকাশ পরিচালনা করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—কর্মচারী না হয়েও তারা কার নির্দেশে সরকারি অফিসে বসে গ্রাহকদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে কাজ করছেন এবং তাদের পারিশ্রমিকের উৎস কী।

নতুন গাড়ি বা মোটরসাইকেলের নিবন্ধন করতে গিয়েও ভোগান্তির শেষ নেই বলে জানান সেবা প্রত্যাশীরা। নির্ধারিত সময়ের পর নিবন্ধন করাতে গেলে ‘লেট ফাইন’-এর  নামে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয় বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষ চালক তৈরির পরিবর্তে যদি অবৈধ উপায়ে লাইসেন্স প্রদান করা হয়, তাহলে তা সড়ক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই লাইসেন্স প্রদান, ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিট প্রদানের ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

একজন ট্রাফিক কর্মকর্তা বলেন, “চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব, ট্রাফিক আইন ও সিগন্যাল অমান্য এবং যানবাহনের অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে পুলিশ সজাগ রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।”

পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিআরটিএর কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী লাইসেন্স, ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিট প্রদানের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই করছেন না। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ অর্থের বিনিময়ে সড়কে চলাচলের অনুপযোগী যানবাহনকেও ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিট প্রদান করা হচ্ছে। ফলে সড়ক নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষ চালক তৈরি, যানবাহনের যথাযথ ফিটনেস পরীক্ষা এবং বিআরটিএর সেবা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সেবা প্রত্যাশীদের ভোগান্তি কমবে এবং সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরও কার্যকর হবে বলে আশা করছেন তারা।