নীলনদের তীরে গড়ে ওঠা প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিসর (مصر) শুধু পিরামিড, স্ফিংক্স কিংবা ফেরাউনের ইতিহাসের জন্যই বিখ্যাত নয়; মুসলমানদের কাছেও এর রয়েছে অসাধারণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক মর্যাদা। পবিত্র কুরআনে একাধিকবার এ দেশের নাম উল্লেখ হয়েছে। নবী-রাসুলদের জীবন, ইসলামের বিজয়, সাহাবিদের পদচারণা, আল-আজহারের হাজার বছরের জ্ঞানচর্চা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর বিশেষ সুসংবাদ— সব মিলিয়ে মিসর ইসলামি ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।
স্থানীয়ভাবে মিসরকে বলা হয় ‘উম্মুদ দুনিয়া’ (أم الدنيا)—অর্থাৎ ‘পৃথিবীর মা’। ইতিহাস, জ্ঞান, সভ্যতা ও ঈমানের এক অপূর্ব মিলনস্থল হিসেবে এই উপাধি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
পবিত্র কুরআনে বিশেষভাবে উল্লেখিত একটি দেশ
বিশ্বের খুব অল্প কয়েকটি দেশের নামই পবিত্র কুরআনে সরাসরি এসেছে। মিসর তাদের অন্যতম। আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَلَمَّا دَخَلُوا عَلَىٰ يُوسُفَ آوَىٰ إِلَيْهِ أَبَوَيْهِ وَقَالَ ادْخُلُوا مِصْرَ إِنْ شَاءَ اللَّهُ آمِنِينَ
‘অতঃপর তারা যখন ইউসুফের কাছে প্রবেশ করল, তিনি তার পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দিলেন এবং বললেন, আল্লাহ চাইলে তোমরা নিরাপদে মিসরে প্রবেশ কর।’ (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৯৯)
কুরআনের বিভিন্ন স্থানে মিসরকে নিরাপদ, উর্বর ও সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সুরা ইউসুফ ও সুরা কাসাসসহ একাধিক সুরায় এই ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা এসেছে।
ইউসুফ (আ.) ও মুসা (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত ভূমি
মিসরের ইতিহাসে হজরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবন একটি অনন্য অধ্যায়। আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে তিনি মিসরের অর্থনীতি ও খাদ্যব্যবস্থার দায়িত্ব লাভ করেন। তার দূরদর্শী পরিকল্পনার ফলে দীর্ঘ দুর্ভিক্ষ থেকে দেশটি রক্ষা পায়। পরবর্তীতে তার আহ্বানে হজরত ইয়াকুব (আ.) ও তার পরিবার মিসরে আগমন করেন, যা বনি ইসরাইলের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে হজরত মুসা (আ.)-এর দাওয়াত, ফেরাউনের সীমাহীন অত্যাচার, আল্লাহর নির্দেশে সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়া এবং বনি ইসরাইলের মুক্তি—এসব ঐতিহাসিক ঘটনাও মিসরকে কেন্দ্র করেই সংঘটিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ مُوسَىٰ أَنِ اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْبَحْرَ ۖ فَانفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقٍ كَالطَّوْدِ الْعَظِيمِ
‘তখন আমি মুসার প্রতি ওহি করলাম, তোমার লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করো। ফলে সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল এবং প্রতিটি অংশ বিশাল পর্বতের মতো হয়ে দাঁড়াল।’ (সুরা আশ-শুআরা: আয়াত ৬৩)
মিসর সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর সুসংবাদ
রাসুলুল্লাহ (সা.) মিসর বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছিলেন এবং দেশটির মানুষের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন।
إِنَّكُمْ سَتَفْتَحُونَ مِصْرَ ... فَاسْتَوْصُوا بِأَهْلِهَا خَيْرًا، فَإِنَّ لَهُمْ ذِمَّةً وَرَحِمًا
‘অচিরেই তোমরা মিসর বিজয় করবে... তখন তোমরা সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে সদাচরণ করবে। কেননা তাদের সঙ্গে তোমাদের অঙ্গীকার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। (মুসলিম ২৫৪৩)
আলেমগণের মতে, এখানে আত্মীয়তার সম্পর্ক বলতে মূলত হজরত হাজেরা (আ.) এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর স্ত্রী মারিয়া কিবতিয়া (রা.)-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সম্পর্ককে বোঝানো হয়েছে।
সাহাবিদের হাত ধরে ইসলামের নতুন দিগন্ত
দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে ২০ হিজরিতে (৬৪১ খ্রিস্টাব্দ) সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.)-এর নেতৃত্বে মিসর বিজিত হয়। এই বিজয়ের মাধ্যমে উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের বিস্তারের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। বিজয়ের পর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মসজিদে আমর ইবনুল আস, যা আফ্রিকার প্রথম মসজিদ হিসেবে পরিচিত এবং আজও ইসলামের ইতিহাসের এক অমূল্য নিদর্শন।
মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের রক্ষাকবচ
১২৫৮ সালে মঙ্গোলদের হাতে বাগদাদ ধ্বংস হওয়ার পর মুসলিম বিশ্ব গভীর সংকটে পড়ে। এরপর ১২৬০ সালে বর্তমান ফিলিস্তিনের আইন জালুত প্রান্তরে মিসরের মামলুক বাহিনী সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুজ ও সেনাপতি রুকনুদ্দিন বাইবার্স-এর নেতৃত্বে মঙ্গোলদের প্রথম বড় পরাজয় উপহার দেয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই বিজয় মুসলিম বিশ্বের অস্তিত্ব ও ইসলামি সভ্যতার ধারাবাহিকতা রক্ষায় যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে।
আল-আজহার—এক হাজার বছরের জ্ঞানচর্চার আলোকবর্তিকা
মিসরের সবচেয়ে বড় ইসলামি অবদান নিঃসন্দেহে আল-আজহার। ৯৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠ প্রায় এক হাজার বছর ধরে কুরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও ইসলামি গবেষণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বজুড়ে সম্মান অর্জন করে আসছে। আজও বিশ্বের শতাধিক দেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী এখানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে আসেন।
আরও পড়ুনআরও পড়ুনমিসরের ইতিহাসে দুই ইউসুফের গল্প: কী তাদের পরিচয়?
বিশ্বখ্যাত আলেমদের জ্ঞানভূমি
মিসর বহু যুগ ধরে অসংখ্য প্রখ্যাত আলেম, মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও ফকিহের কর্মভূমি। তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—
আধুনিক যুগেও বিশ্বখ্যাত ক্বারি, গবেষক ও ইসলামি চিন্তাবিদদের মাধ্যমে মিসর তার জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখেছে।
কেন মুসলমানদের কাছে মিসর অনন্য?
মিসর কেবল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি ইসলামি ইতিহাস, নবীদের স্মৃতি, কুরআনের বর্ণনা, রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর সুসংবাদ, সাহাবিদের বিজয় এবং সহস্র বছরের জ্ঞানচর্চার এক জীবন্ত ইতিহাস।
এখানে একদিকে যেমন নবী ইউসুফ (আ.) ও মুসা (আ.)-এর স্মৃতি জড়িয়ে আছে, অন্যদিকে রয়েছে ইসলামের বিস্তার, আল-আজহারের জ্ঞানধারা এবং অসংখ্য মনীষীর অবদান।
মিসরের গুরুত্ব শুধুমাত্র তার প্রাচীন সভ্যতা বা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নয়; বরং কুরআন, হাদিস ও ইসলামি ইতিহাসে এর গভীর উপস্থিতিই মুসলমানদের কাছে এ ভূখণ্ডকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। নবী-রাসুলদের পদচিহ্ন, সাহাবিদের সংগ্রাম, ইসলামি জ্ঞানচর্চার হাজার বছরের ঐতিহ্য এবং মুসলিম সভ্যতা রক্ষায় এর অবদান— সব মিলিয়ে মিসর ইসলামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
তাই মিসরকে জানা মানে শুধু একটি দেশের ইতিহাস জানা নয়; বরং ইসলামি সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে জানা। আল্লাহ তাআলা আমাদের কুরআন, সুন্নাহ ও ইসলামের গৌরবময় ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সে অনুযায়ী জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র: সূরা ইউসুফ, সূরা কাসাস, সূরা আশ-শু'আরা, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, তারীখুল খুলাফা এবং নির্ভরযোগ্য ইসলামি ইতিহাসগ্রন্থ।