ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
দৈনিক আজকের দিন

ধর্ম

নবদম্পতির জন্য যেভাবে দোয়া করতেন নবীজি (সা.)

নবদম্পতির জন্য যেভাবে দোয়া করতেন নবীজি (সা.)

ইসলামে বিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র সম্পর্ক, যা মানুষের জীবনকে পূর্ণতা দেয় এবং সুখ-শান্তির এক অনাবিল উৎস তৈরি করে। বিয়ে মানুষের জীবনে মানসিক, শারীরিক ও আধ্যাত্মিক স্থিতিশীলতা এনে দেয়। ইসলামে বিয়েকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর হাদিস থেকে স্পষ্ট অনুমেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি বিয়ে করল, সে তার অর্ধেক দ্বীন (ইমান) পূর্ণ করল। অতএব, বাকি অর্ধেকের বিষয়ে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।’ (আল-মুজামুল আওসাত লিত-তাবারানি) সুন্নত তরিকায় অত্যন্ত সহজ ও সরলভাবে বিয়ে সম্পাদন করা হলে সেই দাম্পত্য জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে অশেষ রহমত ও বরকত নেমে আসে। বিয়ের খরচ ও আড়ম্বর প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই সেই বিয়ে সবচেয়ে বেশি বরকতপূর্ণ হয়, যে বিয়েতে খরচ ও ঝামেলা কম হয়।’ (মুসনাদে আহমাদ ও মুস্তাদরাকে হাকিম) দাম্পত্য জীবনে সুখ ও পারিবারিক শান্তি বজায় রাখতে বিয়ের ক্ষেত্রে ইসলাম কিছু সুন্দর দিকনির্দেশনা ও সুন্নাহ অনুসরণের তাগিদ দিয়েছে—ক. অপচয়মুক্ত থাকা: বিয়েতে যেকোনো ধরনের অপচয়, অপব্যয় এবং বিজাতীয় অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত থাকা আবশ্যক। খ. যৌতুকমুক্ত বিয়ে: বিয়েতে কনেপক্ষের ওপর কোনো ধরনের যৌতুকের শর্ত বা আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ হারাম। গ. সহজ দেনমোহর: সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত দেনমোহর ধার্য না করে, বরের সাধ্যের মধ্যে সম্মানজনক মোহর নির্ধারণ করা সুন্নত। (তাবারানি আওসাত, সুনানে আবু দাউদ) নতুন বর-কনের বিয়ের পর তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় এবং উত্তম উপহার হলো নবীজি (সা.)-এর শেখানো ভাষায় তাঁদের জন্য বরকতের দোয়া করা। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো বিবাহিত ব্যক্তিকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়ে এই দোয়াটি পাঠ করতেন—‘বারাকাল্লাহু লাকা, ওয়া বারাকা আলাইকা, ওয়া জামাআ বাইনাকুমা ফি খাইরিন।’ অর্থ: ‘আল্লাহ তোমাকে বরকত দান করুন, তোমাদের উভয়ের প্রতি বরকত নাজিল করুন এবং তোমাদের উভয়কে কল্যাণের সঙ্গে একত্রে রাখুন।’ (জামে তিরমিজি)

গিবত বনাম সত্য কথা— পার্থক্যটা আসলে কোথায়?

ইসলামে কথা বলা একটি আমানত। প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি মন্তব্য এবং প্রতিটি সমালোচনার পেছনে রয়েছে নৈতিক ও শরিয়তের একটি সীমারেখা। কিন্তু বর্তমান সময়ে একটি বাক্য প্রায়ই শোনা যায়—‘আমি তো সত্য কথাই বলেছি।’ এই যুক্তির আড়ালে অনেক সময় মানুষের সম্মানহানি, বিদ্বেষ ছড়ানো এবং ব্যক্তিগত আঘাত লুকিয়ে থাকে। ফলে প্রশ্ন জাগে— সব সত্য কথা কি হক কথা? আর কোথায় গিয়ে সত্য কথা গিবতে পরিণত হয়? ইসলাম এই প্রশ্নের খুব স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ উত্তর দিয়েছে। কুরআন, সহিহ হাদিস এবং ফিকহবিদদের ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়— সত্য বলা তখনই ইবাদত, যখন তা প্রয়োজন, শালীনতা ও উদ্দেশ্য-সঠিকতার সীমার মধ্যে থাকে। গিবত কী? গিবত (غيبة) অর্থ—কাউকে তার অনুপস্থিতিতে এমনভাবে উল্লেখ করা, যা সে শুনলে অপছন্দ করবে, যদিও তা সত্য হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে গিবতের সংজ্ঞা দেন এভাবে— قِيلَ: أَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ؟ قَالَ: إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَتَّهُ ‘যদি তার মধ্যে সেই দোষ থাকে তবে তুমি তার গিবত করলে, আর যদি না থাকে তবে তুমি তার ওপর অপবাদ (বুহতান) আরোপ করলে।’ মুসলিম ২৫৮৯, আবু দাউদ ৪৮৭৪, তিরমিজি ১৯৩৪) অর্থাৎ, সত্য হলেও যদি তা অনুপস্থিত ব্যক্তির সম্মানহানির উদ্দেশ্যে বলা হয়, সেটিই গিবত। কুরআনের দৃষ্টিতে গিবত আল্লাহ তাআলা বলেন— وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا ‘তোমরা একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?’ (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১২) এই আয়াতে গিবতকে মৃত মানুষের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে—যা এর ভয়াবহতা ও নৈতিক জঘন্যতা প্রকাশ করে। হাদিসে গিবতের ভয়াবহ চিত্র রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন— مَرَرْتُ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي عَلَى قَوْمٍ لَهُمْ أَظْفَارٌ مِنْ نُحَاسٍ يَخْمِشُونَ وُجُوهَهُمْ وَصُدُورَهُمْ ‘মেরাজের রাতে আমি এমন কিছু লোককে দেখলাম, যাদের নখ ছিল তামার, তারা নিজেদের মুখ ও বুক আঁচড়াচ্ছিল।’ জিবরাইল (আ.) বললেন,  ‘এরা সেই লোক, যারা মানুষের গোশত খেত (অর্থাৎ গিবত করত)।’ (আবু দাউদ ৪৮৭৮) এটি গিবতের আখিরাতের ভয়াবহ শাস্তির একটি ইঙ্গিত। সত্য কথা কি সবসময় গিবত নয়? না। ইসলাম কখনো সত্য বলাকে নিষিদ্ধ করেনি। তবে উদ্দেশ্য, প্রয়োজন এবং প্রেক্ষাপট—এই তিনটি বিষয় এখানে মূল। ফকিহদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী গিবতের বাইরে কিছু বৈধ ক্ষেত্র রয়েছে— ১. জুলুম প্রতিরোধ ও বিচার চাওয়া لَا يُحِبُّ اللَّهُ الْجَهْرَ بِالسُّوءِ إِلَّا مَن ظُلِمَ ‘আল্লাহ প্রকাশ্যে মন্দ কথা বলা পছন্দ করেন না, তবে যার ওপর জুলুম করা হয়েছে তার কথা আলাদা।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১৪৮) ২. পরামর্শ ও সতর্কতা প্রতারণাকারী বা ক্ষতিকর ব্যক্তির বিষয়ে সতর্ক করা বৈধ। ৩. দ্বীনি ভুল সংশোধন যখন কেউ প্রকাশ্যে ভুল আকিদা বা বিভ্রান্তি ছড়ায়, তখন দলিলসহ তার ভুল সংশোধন করা জায়েজ— যদি উদ্দেশ্য হয় সংশোধন, অপমান নয়। ৪. পরিচয়ের প্রয়োজনে যেমন— ‘অমুক অন্ধ ব্যক্তি’ বলা, যদি অন্যভাবে চেনানো না যায়। ইমাম নববী (রহ.)-এর ব্যাখ্যা ইমাম নববী (রহ.) বলেন, মানুষের শরীর, চরিত্র, দ্বীন, পরিবার, পোশাক বা আচরণ নিয়ে এমন কিছু বলা, যা সে অপছন্দ করে—তা গিবত, এমনকি ইঙ্গিত বা ইশারার মাধ্যমেও। আজকের যুগে এটি আরও বিস্তৃত— ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব ভিডিও, ইনবক্স ফাঁস, মিম, স্ক্রিনশট— সবই গিবতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। সত্য কথা কখন গিবতে পরিণত হয়? একটি সত্য কথা তখনই গিবত হয়ে যায়, যখন— রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ ‘যে আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’ (বুখারি, মুসলিম) আরও পড়ুনআরও পড়ুন৬টি গুণ অর্জনেই জান্নাতের নিশ্চয়তা! আধুনিক যুগের গিবত আজ গিবত শুধু মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নয়। এর নতুন রূপগুলো হলো— এসবও অনেক সময় সরাসরি গিবতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। মূল কথা— গিবত এবং সত্য কথার মূল পার্থক্য হলো উপস্থিতি এবং উদ্দেশ্য। সত্য কথা হলো যা বাস্তবে ঘটেছে তা প্রকাশ করা, আর গিবত হলো কারো অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো সত্য দোষ বা দুর্বলতা আলোচনা করা, যা শুনলে সে কষ্ট পাবে। সত্য মিথ্যা হলে তা অপবাদ হয়, কিন্তু সত্য হলেও গিবত হতে পারে। গিবত ও সত্য কথার তুলনামূলক পার্থক্য সত্য কথা (সাধারণ): কোনো ব্যক্তির সামনে বা পেছনে তার ভালো কাজের প্রশংসা করা, গঠনমূলক সমালোচনা করা, বা সঠিক তথ্য তুলে ধরা। গিবত (পরনিন্দা): কারো অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো দোষ বা গোপনীয়তা অন্যের কাছে বলা, যা সে জানলে অপছন্দ বা দুঃখিত হবে। গিবত হয়ে গেলে করণীয় ইসলাম সত্যকে নিষিদ্ধ করেনি, কিন্তু সত্য ব্যবহারে দায়িত্বশীল হতে শিখিয়েছে। প্রতিটি সত্য কথা যেমন হক কথা নয়, তেমনি প্রতিটি সমালোচনাও দ্বীনি কাজ নয়। কথা বলার আগে একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো— উদ্দেশ্য, প্রয়োজন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা আমাদের সামনে একটি সরল নীতি স্থাপন করে দিয়েছে— ‘ভালো কথা বলো, নতুবা চুপ থাকো।’ এই নীতি মানতে পারলেই সমাজ থেকে গিবতের বিষ দূর হবে এবং হৃদয়গুলো শান্তিতে ভরে উঠবে।

গিবত বনাম সত্য কথা— পার্থক্যটা আসলে কোথায়?

আজকের নামাজের সময়সূচি: ০৭ জুলাই ২০২৬

জীবনকে সুশৃঙ্খল করতে এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য পেতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের কোনো বিকল্প নেই। একজন মুমিনের জন্য নামাজ হলো আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও জীবনের বরকত লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম। প্রতিদিন সময়মতো নামাজ আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। নিচে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য আজকের নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো। ঢাকার সময়ের সাথে দেশের বিভিন্ন জেলার সময়ের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ঢাকার সময়ের সাথে নিচের সময়গুলো যোগ বা বিয়োগ করে আপনার এলাকার সঠিক সময় জেনে নিন: বিয়োগ করতে হবে যোগ করতে হবে নামাজ আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি যেমন আমাদের দৈহিক পবিত্রতা নিশ্চিত করে, তেমনই আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। আজকের এই নামাজের সময়সূচি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবনের ব্যস্ততা যতই থাকুক না কেন, আল্লাহর জন্য সময় বের করা আমাদের প্রধান দায়িত্ব। আসুন, নামাজের মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে তাঁর আরও কাছে নিয়ে যাই। জীবনে নিয়ে আসি ইমানের নুর।

আজকের নামাজের সময়সূচি: ০৭ জুলাই ২০২৬

যে ঘরে নেমে আসে আল্লাহর রহমত

মানুষের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায় তার নিজের পরিবারের সঙ্গে আচরণে। বাইরের মানুষের কাছে ভদ্র ও হাস্যোজ্জ্বল হওয়া সহজ, কিন্তু পরিবারের সদস্যদের প্রতি ধৈর্য, কোমলতা, ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনই একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়। ইসলাম শুধু ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; বরং ঘরকে ভালোবাসা, দয়া ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে জান্নাতের বাগানে পরিণত করারও শিক্ষা দেয়। তাই যে ব্যক্তি পরিবারের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করে, সে ঘরে নেমে আসে আল্লাহর রহমত ও সে-ই প্রকৃত অর্থে পরিপূর্ণ ইমানের অধিকারী। পরিবারের প্রতি উত্তম আচরণই পরিপূর্ণ ইমানের নিদর্শন উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘মুমিনদের মধ্যে ইমানে সর্বাধিক পরিপূর্ণ সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম এবং যে তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি সবচেয়ে কোমল ও সদয় আচরণ করে।’ (তিরমিজি ২৬১২) এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, ঈমানের পরিপূর্ণতার অন্যতম মানদণ্ড হলো উত্তম চরিত্র এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি সুন্দর আচরণ। একজন মানুষের প্রকৃত নৈতিকতা ও তাকওয়ার পরিচয় সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় তার ঘরের মানুষদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমেই। আরও পড়ুনআরও পড়ুনযে ক্ষমা জান্নাতে যাওয়ার এক মহৎ আমল কুরআনের আলোকে ১. পরিবারে সুন্দরভাবে জীবনযাপনের নির্দেশ وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ‘তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে সদ্ভাবে ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে জীবনযাপন কর।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১৯) ২. দয়া ও কোমলতা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ ‘আল্লাহর বিশেষ রহমতের কারণেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৫৯) এ বিষয়ে আরও একটি হাদিস রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের জন্য সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের জন্য তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।’ (তিরমিজি ৩৮৯৫, ইবনু মাজাহ ১৯৭৭) শিক্ষণীয় বিষয়— পরিবার হলো একজন মানুষের প্রথম বিদ্যালয় এবং ইমানের বাস্তব পরীক্ষার ক্ষেত্র। আমাদের নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদতের পাশাপাশি পরিবারের প্রতি আমাদের আচরণও আল্লাহর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আসুন, আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে বাবা-মা, স্ত্রী, স্বামী, সন্তান, ভাই-বোন এবং পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান, ধৈর্য ও কোমলতার সঙ্গে আচরণ করি। কারণ যে ব্যক্তি নিজের পরিবারের জন্য উত্তম, সে-ই আল্লাহর কাছে প্রকৃত উত্তম বান্দা এবং পরিপূর্ণ ইমানের অধিকারী। হে আল্লাহ! আমাদের চরিত্রকে সুন্দর করুন, আমাদের পরিবারে ভালোবাসা, দয়া ও শান্তি দান করুন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শে জীবন পরিচালনার তৌফিক দান করুন। আমিন।

যে ঘরে নেমে আসে আল্লাহর রহমত

মিসরের জন্য নবীজি (সা.) কী সুসংবাদ দিয়েছিলেন?

নীলনদের তীরে গড়ে ওঠা প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিসর (مصر) শুধু পিরামিড, স্ফিংক্স কিংবা ফেরাউনের ইতিহাসের জন্যই বিখ্যাত নয়; মুসলমানদের কাছেও এর রয়েছে অসাধারণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক মর্যাদা। পবিত্র কুরআনে একাধিকবার এ দেশের নাম উল্লেখ হয়েছে। নবী-রাসুলদের জীবন, ইসলামের বিজয়, সাহাবিদের পদচারণা, আল-আজহারের হাজার বছরের জ্ঞানচর্চা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর বিশেষ সুসংবাদ— সব মিলিয়ে মিসর ইসলামি ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। স্থানীয়ভাবে মিসরকে বলা হয় ‘উম্মুদ দুনিয়া’ (أم الدنيا)—অর্থাৎ ‘পৃথিবীর মা’। ইতিহাস, জ্ঞান, সভ্যতা ও ঈমানের এক অপূর্ব মিলনস্থল হিসেবে এই উপাধি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। পবিত্র কুরআনে বিশেষভাবে উল্লেখিত একটি দেশ বিশ্বের খুব অল্প কয়েকটি দেশের নামই পবিত্র কুরআনে সরাসরি এসেছে। মিসর তাদের অন্যতম। আল্লাহ তাআলা বলেন— فَلَمَّا دَخَلُوا عَلَىٰ يُوسُفَ آوَىٰ إِلَيْهِ أَبَوَيْهِ وَقَالَ ادْخُلُوا مِصْرَ إِنْ شَاءَ اللَّهُ آمِنِينَ ‘অতঃপর তারা যখন ইউসুফের কাছে প্রবেশ করল, তিনি তার পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দিলেন এবং বললেন, আল্লাহ চাইলে তোমরা নিরাপদে মিসরে প্রবেশ কর।’ (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৯৯) কুরআনের বিভিন্ন স্থানে মিসরকে নিরাপদ, উর্বর ও সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সুরা ইউসুফ ও সুরা কাসাসসহ একাধিক সুরায় এই ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা এসেছে। ইউসুফ (আ.) ও মুসা (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত ভূমি মিসরের ইতিহাসে হজরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবন একটি অনন্য অধ্যায়। আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে তিনি মিসরের অর্থনীতি ও খাদ্যব্যবস্থার দায়িত্ব লাভ করেন। তার দূরদর্শী পরিকল্পনার ফলে দীর্ঘ দুর্ভিক্ষ থেকে দেশটি রক্ষা পায়। পরবর্তীতে তার আহ্বানে হজরত ইয়াকুব (আ.) ও তার পরিবার মিসরে আগমন করেন, যা বনি ইসরাইলের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় সৃষ্টি করে। অন্যদিকে হজরত মুসা (আ.)-এর দাওয়াত, ফেরাউনের সীমাহীন অত্যাচার, আল্লাহর নির্দেশে সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়া এবং বনি ইসরাইলের মুক্তি—এসব ঐতিহাসিক ঘটনাও মিসরকে কেন্দ্র করেই সংঘটিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন— فَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ مُوسَىٰ أَنِ اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْبَحْرَ ۖ فَانفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقٍ كَالطَّوْدِ الْعَظِيمِ ‘তখন আমি মুসার প্রতি ওহি করলাম, তোমার লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করো। ফলে সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল এবং প্রতিটি অংশ বিশাল পর্বতের মতো হয়ে দাঁড়াল।’ (সুরা আশ-শুআরা: আয়াত ৬৩) মিসর সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর সুসংবাদ রাসুলুল্লাহ (সা.) মিসর বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছিলেন এবং দেশটির মানুষের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। إِنَّكُمْ سَتَفْتَحُونَ مِصْرَ ... فَاسْتَوْصُوا بِأَهْلِهَا خَيْرًا، فَإِنَّ لَهُمْ ذِمَّةً وَرَحِمًا ‘অচিরেই তোমরা মিসর বিজয় করবে... তখন তোমরা সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে সদাচরণ করবে। কেননা তাদের সঙ্গে তোমাদের অঙ্গীকার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। (মুসলিম ২৫৪৩) আলেমগণের মতে, এখানে আত্মীয়তার সম্পর্ক বলতে মূলত হজরত হাজেরা (আ.) এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর স্ত্রী মারিয়া কিবতিয়া (রা.)-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সম্পর্ককে বোঝানো হয়েছে। সাহাবিদের হাত ধরে ইসলামের নতুন দিগন্ত দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে ২০ হিজরিতে (৬৪১ খ্রিস্টাব্দ) সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.)-এর নেতৃত্বে মিসর বিজিত হয়। এই বিজয়ের মাধ্যমে উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের বিস্তারের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। বিজয়ের পর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মসজিদে আমর ইবনুল আস, যা আফ্রিকার প্রথম মসজিদ হিসেবে পরিচিত এবং আজও ইসলামের ইতিহাসের এক অমূল্য নিদর্শন। মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের রক্ষাকবচ ১২৫৮ সালে মঙ্গোলদের হাতে বাগদাদ ধ্বংস হওয়ার পর মুসলিম বিশ্ব গভীর সংকটে পড়ে। এরপর ১২৬০ সালে বর্তমান ফিলিস্তিনের আইন জালুত প্রান্তরে মিসরের মামলুক বাহিনী সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুজ ও সেনাপতি রুকনুদ্দিন বাইবার্স-এর নেতৃত্বে মঙ্গোলদের প্রথম বড় পরাজয় উপহার দেয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এই বিজয় মুসলিম বিশ্বের অস্তিত্ব ও ইসলামি সভ্যতার ধারাবাহিকতা রক্ষায় যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। আল-আজহার—এক হাজার বছরের জ্ঞানচর্চার আলোকবর্তিকা মিসরের সবচেয়ে বড় ইসলামি অবদান নিঃসন্দেহে আল-আজহার। ৯৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠ প্রায় এক হাজার বছর ধরে কুরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও ইসলামি গবেষণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বজুড়ে সম্মান অর্জন করে আসছে। আজও বিশ্বের শতাধিক দেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী এখানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে আসেন। আরও পড়ুনআরও পড়ুনমিসরের ইতিহাসে দুই ইউসুফের গল্প: কী তাদের পরিচয়? বিশ্বখ্যাত আলেমদের জ্ঞানভূমি মিসর বহু যুগ ধরে অসংখ্য প্রখ্যাত আলেম, মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও ফকিহের কর্মভূমি। তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য— আধুনিক যুগেও বিশ্বখ্যাত ক্বারি, গবেষক ও ইসলামি চিন্তাবিদদের মাধ্যমে মিসর তার জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখেছে। কেন মুসলমানদের কাছে মিসর অনন্য? মিসর কেবল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি ইসলামি ইতিহাস, নবীদের স্মৃতি, কুরআনের বর্ণনা, রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর সুসংবাদ, সাহাবিদের বিজয় এবং সহস্র বছরের জ্ঞানচর্চার এক জীবন্ত ইতিহাস। এখানে একদিকে যেমন নবী ইউসুফ (আ.) ও মুসা (আ.)-এর স্মৃতি জড়িয়ে আছে, অন্যদিকে রয়েছে ইসলামের বিস্তার, আল-আজহারের জ্ঞানধারা এবং অসংখ্য মনীষীর অবদান। মিসরের গুরুত্ব শুধুমাত্র তার প্রাচীন সভ্যতা বা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নয়; বরং কুরআন, হাদিস ও ইসলামি ইতিহাসে এর গভীর উপস্থিতিই মুসলমানদের কাছে এ ভূখণ্ডকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। নবী-রাসুলদের পদচিহ্ন, সাহাবিদের সংগ্রাম, ইসলামি জ্ঞানচর্চার হাজার বছরের ঐতিহ্য এবং মুসলিম সভ্যতা রক্ষায় এর অবদান— সব মিলিয়ে মিসর ইসলামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাই মিসরকে জানা মানে শুধু একটি দেশের ইতিহাস জানা নয়; বরং ইসলামি সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে জানা। আল্লাহ তাআলা আমাদের কুরআন, সুন্নাহ ও ইসলামের গৌরবময় ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সে অনুযায়ী জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন। আমিন। তথ্যসূত্র: সূরা ইউসুফ, সূরা কাসাস, সূরা আশ-শু'আরা, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, তারীখুল খুলাফা এবং নির্ভরযোগ্য ইসলামি ইতিহাসগ্রন্থ।

মিসরের জন্য নবীজি (সা.) কী সুসংবাদ দিয়েছিলেন?