ঢাকা    বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩
দৈনিক আজকের দিন
ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক ‘বাতিল’: ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক ‘বাতিল’: ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কার্যত বাতিল হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তিনি জানিয়েছেন, আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করা হচ্ছে না। বুধবার (৮ জুলাই) তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার কাছে বিষয়টি শেষ। আমি আর তাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না। তাদের সঙ্গে আলোচনা করা সময়ের অপচয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা অত্যন্ত খারাপ মানুষ। তাদের নেতৃত্বও খারাপ মানুষের হাতে। তারা সহিংস। তাদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে তারা তা ব্যবহার করত। আমার দৃষ্টিতে বিষয়টি শেষ।’ তবে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা চাইলে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারেন। যদিও তিনি আলোচনার সফলতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, ‘তারা কথা বলতে পারে, কিন্তু আমার মনে হয় তারা শুধু সময় নষ্ট করছে।’ ন্যাটো নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনে দেওয়া এক বক্তৃতায় ট্রাম্প আরও জানান যে, তিনি তার ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টকে স্পেনের সঙ্গে সমস্ত বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে মাদ্রিদকে ন্যাটোর একটি ‘ভয়াবহ অংশীদার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন ট্রাম্প। মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্র বন্দর আব্বাস, সিরিক এবং কেশম দ্বীপে ব্যাপক সামরিক হামলা চালায়। একই সঙ্গে ইরানের তেল বিক্রির অনুমতিও বাতিল করে ওয়াশিংটন। এর জবাবে ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে হামলা চালানোর দাবি করেছে। এতে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা ভেঙে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন এলাকায় ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আগের হামলাগুলোর তুলনায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি শক্তিশালী ছিল। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর এটি ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান, যা দুই দেশের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঝুঁকি তৈরি করেছে। সিএনএনের এক কর্মকর্তা জানান, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাব হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযান চালিয়েছে। হামলার সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনির জানাজার আনুষ্ঠানিকতা চলছিল। অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বন্দর মাহশাহর ও বুশেহরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বন্দর মাহশাহরে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর এক সদস্য নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। হামলার জবাবে ইরানের নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বিধ্বংসী জবাব’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি, তেল নিষেধাজ্ঞা, দক্ষিণ ইরানে হামলা এবং লেবাননে ইসরাইলের আগ্রাসন—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে। তার ভাষায়, ‘ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগের যুগ শেষ। ইরান নতি স্বীকার করবে না।’ খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সও দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানিয়ে এটিকে ‘প্রকাশ্য আগ্রাসন’ বলে উল্লেখ করেছে। এক বিবৃতিতে ইরানের সামরিক বাহিনী জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের জবাবে তারা ‘বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া’ দেখাবে এবং হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না। পরে বাহরাইন ও কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা জারি করা হয়। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী উভয় দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করে। এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক আনোয়ার গারগাশ বলেন, বাহরাইন ও কুয়েতে ইরানের হামলা প্রমাণ করে যে তেহরান এখনো উত্তেজনা কমানোর প্রয়োজনীয়তা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।

ইরাক–সিরিয়াকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় জোটের পথে যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরাক ও সিরিয়া। তিনটি সিরীয়, পশ্চিমা ও ইরাকি সূত্র গত সোমবার লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম আশারক আল–আওসাতকে এ তথ্য জানিয়েছে। সূত্রগুলোর মতে, ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদির জুলাইয়ের মাঝামাঝি ওয়াশিংটন সফরের সময় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যে এমন একটি নতুন আঞ্চলিক জোটের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী আঞ্চলিক শিবির থেকে দেশ দুটির সরে আসার ইঙ্গিত বহন করছে। সিরীয় সূত্র জানিয়েছে, সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি জুলাইয়ের মাঝামাঝি ওয়াশিংটন সফরে যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সেখানে ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি অথবা তাঁর সফরসঙ্গী ইরাকি কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফাঁকে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। পশ্চিমা একটি সূত্রের ভাষ্য, এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে হোয়াইট হাউসে আল-জাইদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাশিত বৈঠকের পর। সিরীয় সূত্রটি আরও জানায়, বাগদাদ ও দামেস্কের মধ্যকার এই চুক্তির পৃষ্ঠপোষকতা করবেন সিরিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত টম ব্যারাক। চলমান কারিগরি ও রাজনৈতিক সমঝোতা চূড়ান্ত হলে পরবর্তী সময়ে অন্যান্য আরব দেশও এতে যোগ দিতে পারে। অন্যদিকে, একটি ইরাকি সূত্র আল-জাইদির সঙ্গে সিরীয় কর্মকর্তাদের বৈঠক হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিতও করেনি, তবে অস্বীকারও করেনি। তবে আগের ইরাকি সরকারের একজন রাজনৈতিক উপদেষ্টা বলেছেন, আল-জাইদির দল সিরিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিচ্ছে। আরেকটি ইরাকি সূত্র জানিয়েছে, ১৫ জুলাই শুরু হয়ে প্রায় চার দিনব্যাপী আল-জাইদির ওয়াশিংটন সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট, রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এবং মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এরপর তিনি টেক্সাস সফর করবেন, যেখানে বড় বড় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অতিরিক্ত বৈঠক করার কথা রয়েছে। এক ইরাকি সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে ওয়াশিংটন সফরে যাচ্ছেন এবং ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকই সফরের প্রধান এজেন্ডা। তবে তিনি অন্য কোনো দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরাকি সরকার সমান্তরালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ করছে। প্রথমত, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এনে সেগুলোকে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির অভিযোগে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, যাঁদের মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও রয়েছেন, যাঁদের সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। একই সময়ে মার্কিন প্রশাসন ইরাকের ওপর ইরানের প্রভাব কমানোর জন্য চাপ অব্যাহত রাখায় বাগদাদও ক্রমশ ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, আল-জাইদির সরকার আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। এটি এমন একটি নতুন আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, যা বাগদাদ, ওয়াশিংটন ও তেহরানের পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে। ইরাক বর্তমানে তেল রপ্তানির পথ বৈচিত্র্যময় করার পাশাপাশি প্রচলিত সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, সিরিয়া নিজের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি ও বাণিজ্যের আঞ্চলিক করিডর হিসেবে নিজেদের ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আশা করছে। পশ্চিমা সূত্রটি জানিয়েছে, সিরিয়ায় মার্কিন দূত টম বারাক ইরাক ও সিরিয়াকে ঘিরে তাঁর কৌশলকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে কাজ করছেন। তাঁর লক্ষ্য হলো ইরাক, সিরিয়া এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের স্বার্থকে একত্রিত করে একটি ‘নতুন স্বার্থভিত্তিক জোটের মূল ভিত্তি’ গড়ে তোলা। এই জোটের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর একটি সংক্ষিপ্ত রুট তৈরি হবে, যা হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাবে। প্রস্তাবিত রূপে চুক্তিটি সম্পন্ন হলে এটি মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রতিফলন হবে। এতে ইরাককে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের সঙ্গে সংযুক্তকারী আন্তঃসীমান্ত অবকাঠামো প্রকল্পগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক জ্বালানি প্রবাহ পুনর্গঠনে সিরিয়াকে আরও বড় ভূমিকা দেওয়া হবে। এক ইরাকি গবেষকের মতে, আল-জাইদির এই সফর ইরাকের আঞ্চলিক অবস্থান পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে একটি রূপান্তরমূলক মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, এটি অনেকটা ২০২৫ সালের নভেম্বরে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার হোয়াইট হাউস সফরের মতো, যেটিকে সিরিয়ার ইরানপন্থী শিবির থেকে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শিবিরে সরে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আকিল আব্বাস বলেছেন, ওয়াশিংটনে আল-জাইদির সফরের গুরুত্ব অনেকটাই আল-শারার সফরের মতো। ওয়াশিংটনভিত্তিক এই বিশ্লেষকের মতে, আল-শারার সফরের মূল তাৎপর্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানে থাকা একটি দেশ থেকে সিরিয়ার যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী জোটের অংশীদারে পরিণত হওয়া। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন চায় ইরাকও একই পথে এগিয়ে যাক। তবে সেটি হতে হবে সুস্পষ্ট, পরিমাপযোগ্য এবং যাচাইযোগ্য পদক্ষেপের মাধ্যমে, যার মধ্যে আঞ্চলিক জ্বালানি পাইপলাইন সংযোগকারী প্রকল্পগুলোও থাকবে। আব্বাসের ভাষায়, ‘ওয়াশিংটন চায়, বাগদাদ-দামেস্ক জোটের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব কমে আসুক এবং ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা যুদ্ধ শুরু হলে ওই প্রণালির প্রভাব সীমিত হয়ে যাক।’

ইরাক–সিরিয়াকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় জোটের পথে যুক্তরাষ্ট্র