ঢাকা    বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩
দৈনিক আজকের দিন
গ্রেগর কোবেল: গোলপোস্টের সামনে এক অদম্য প্রাচীর

গ্রেগর কোবেল: গোলপোস্টের সামনে এক অদম্য প্রাচীর

যারা গোল করেন, আলো ঝলমলে মঞ্চে করতালিও বেশি ওঠে তাদের জন্য। একজন থাকেন গোল করেন না, করানও না। প্রতিপক্ষের গোল করার স্বপ্ন ভেঙে দেন, সেই মানুষটির নাম গ্রেগর কোবেল। একটি দুর্গ। আত্মবিশ্বাসের আরেক নাম। সতীর্থদের কাছে নিশ্চয়তার প্রতীক, প্রতিপক্ষের কাছে এক অবিচল আতঙ্ক। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় কলম্বিয়ার বিপক্ষে ১২০ মিনিটের লড়াই ছিল তার জীবনের অন্যতম সেরা পরীক্ষা। একের পর এক আক্রমণ, দুর্দান্ত শট, বিপজ্জনক হেড সবকিছুর সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন একাই। গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল একটি পাহাড়। ভাগ্য নির্ধারণী টাইব্রেকারে যখন পুরো স্টেডিয়ামের হৃদস্পন্দন থমকে গিয়েছিল, তিনি ছিলেন অবিচল। গুরুত্বপূর্ণ শট ফিরিয়ে দিয়ে সুইজারল্যান্ডকে কোয়ার্টার-ফাইনালে তুললেন। সেই রাতেই তিনি হয়ে উঠলেন সুইস ফুটবলের নতুন মহাকাব্যের নায়ক। ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহরে জন্মগ্রহণ করেন গ্রেগর কোবেল। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল তার অদম্য ভালোবাসা। অন্য শিশুরা যখন গোল করার আনন্দে মেতে উঠত, কোবেল তখন গোল ঠেকানোর আনন্দে মুগ্ধ হতেন। কৈশোরেই সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত ক্লাব গ্রাসহপার জুরিখের যুব দলে যোগ দেন। লম্বা দেহ, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, অসাধারণ লাফ এবং অদ্ভুত শান্ত স্বভাব তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। স্বপ্ন বড় ছিল। খুব অল্প বয়সেই পাড়ি জমান জার্মানিতে। যোগ দেন হফেনহাইমে। দলে সুযোগ পাওয়া ছিল কঠিন। অপেক্ষা করতে হয়েছে। ধার হিসেবে খেলতে হয়েছে আগসবুর্গ এবং স্টুটগার্টে। স্টুটগার্টে সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগান। একের পর এক দুর্দান্ত নৈপুণ্যে প্রমাণ করেন, বড় মঞ্চ তার জন্যই অপেক্ষা করছে। ২০২১ সালে জার্মানির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব বরুশিয়া ডর্টমুন্ড তাকে দলে নেয়। ডর্টমুন্ডের রক্ষণভাগের প্রাণ হয়ে উঠেন। আধুনিক ফুটবলে গোলরক্ষকের কাজ শুধু বল ধরা নয়। আক্রমণ গড়ার সূচনা, রক্ষণভাগকে সংগঠিত রাখা, সতীর্থদের নির্দেশনা দেওয়া সব ক্ষেত্রেই কোবেল অসাধারণ। তার পায়ের নিখুঁত পাস একটি আক্রমণের শুরু করে। সামনে এগিয়ে এসে প্রতিপক্ষের নিশ্চিত গোল নষ্ট করে দেন। গ্রেগর কোবেলের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানসিক দৃঢ়তা। গোলকিপারের একটি ভুলই ম্যাচ হারিয়ে দিতে পারে। কোবেলের মধ্যে বিরল গুণ রয়েছে। গোল হজম করলেও তিনি ভেঙে পড়েন না। অসাধারণ সেভ করেও বাড়তি উচ্ছ্বাসে ভেসে যান না। কয়েক সেকেন্ডেরও কম সময়ে তিনি বলের গতিপথ বুঝে ফেলেন। দুই হাত, দুই পা কিংবা পুরো শরীর ছুড়ে দিয়ে এমন সব বল ঠেকান, দেখে মনে হয় গোল হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। দর্শকরাও বুঝতে পারেন না, কীভাবে সেই বলটি জালে ঢুকল না। কোবেল পুরো মাঠ সামনে থেকে দেখেন। শুধু বল ঠেকান না, রক্ষণভাগ পরিচালনাও করেন। সারাক্ষণ সতীর্থদের সঙ্গে কথা বলেন। কে কোথায় থাকবে, কাকে মার্ক করতে হবে, কখন সামনে উঠতে হবে সবকিছু তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন। এই নেতৃত্বের গুণই তাকে বিশ্বের সেরা গোলকিপারদের কাতারে নিয়ে গেছে। চলতি বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে। ১২০ মিনিট ধরে তিনি সুইজারল্যান্ডকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন। ভাগ্য নির্ধারণী টাইব্রেকারে একটি গুরুত্বপূর্ণ শট ফিরিয়ে দিয়ে দেশের কোটি মানুষের মুখে হাসি ফোটান। একটি জাতির স্বপ্নের সবচেয়ে বড় রক্ষক হয়ে উঠেন। গ্রেগর কোবেল খুব বেশি কথা বলেন না। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিনয়ী। জয়ের কৃতিত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন না। বারবার বলেন, ‘এটি পুরো দলের সাফল্য।’  এ কারণেই সতীর্থরা তাকে এতটা শ্রদ্ধা করেন। ফুটবল ইতিহাসে গোলদাতাদের নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকে। তারা গোল বাঁচিয়ে একটি দেশের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখেন। গ্রেগর কোবেল সেই অসাধারণদের একজন।