ঢাকা    বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩
দৈনিক আজকের দিন

কৃষি

খানসামায় কৃষক কার্ড কার্যক্রম ও কৃষি প্রণোদনার উদ্বোধন

খানসামায় কৃষক কার্ড কার্যক্রম ও কৃষি প্রণোদনার উদ্বোধন

কৃষক কার্ডের তথ্য সংগ্রহে কোনো ধরনের মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত তথ্য দিলে ভবিষ্যতে সরকারি কৃষি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হবে বলে সতর্ক করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের মাননীয় হুইপ ও দিনাজপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আখতারুজ্জামান মিয়া। তিনি বলেন, কৃষক কার্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করে তাদের কাছে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক উপায়ে সরকারি কৃষিসেবা, ভর্তুকি ও প্রণোদনা পৌঁছে দেওয়া। তাই তথ্য সংগ্রহের সময় প্রত্যেক কৃষককে সঠিক ও নির্ভুল তথ্য দিতে হবে।বুধবার (২২ জুলাই) বিকেলে দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা পরিষদ হলরুমে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আয়োজনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের খরিপ-২ মৌসুমে গ্রীষ্মকালীন বিভিন্ন হাইব্রিড ও উফশী জাতের শাকসবজির উৎপাদন ও আবাদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও রাসায়নিক সার বিতরণ এবং কৃষক কার্ডের তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুজ্জামান সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইয়াসমিন আক্তার।প্রধান অতিথির বক্তব্যে হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়া বলেন, সরকারের কৃষি প্রণোদনা ও কৃষক কার্ড কর্মসূচিকে শতভাগ সফল করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকতা, সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। কৃষকদের দেওয়া বীজ ও অন্যান্য সহায়তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হয়। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ও সরকারি সহায়তার সঠিক ব্যবহারই কৃষির টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কৃষক কার্ড কার্যক্রম পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু হয়েছে। প্রথম ধাপে গোবিন্দপুর ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে উপজেলার সব ইউনিয়ন এবং পরে সারা দেশের কৃষকদের এ কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে।তিনি বলেন, কৃষক কার্ডের জন্য জমির পরিমাণ, আবাদকৃত ফসলসহ সব তথ্য সঠিকভাবে দিতে হবে। কোনো ধরনের মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত তথ্য দিলে যাচাই-বাছাইয়ের সময় তা ধরা পড়বে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। এজন্য তথ্য সংগ্রহে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সহযোগিতা করার পাশাপাশি কৃষকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।হুইপ আরও বলেন, কৃষক কার্ড শুধু ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য নয়; বড় কৃষক, বর্গাচাষি ও চুক্তিভিত্তিক চাষিরাও এ কার্যক্রমের আওতায় আসবেন। একটি নির্ভুল কৃষক ডাটাবেজ তৈরি হলে কার কত জমি রয়েছে, কোথায় কী ফসলের আবাদ হচ্ছে এবং কী পরিমাণ কৃষি উপকরণ প্রয়োজন—এসব তথ্যের ভিত্তিতে সরকার পরিকল্পিতভাবে ভর্তুকি, কৃষি প্রণোদনা, কৃষিঋণ ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান করতে পারবে। এতে কৃষি খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন আরও নিশ্চিত হবে।অনুষ্ঠান শেষে প্রধান অতিথি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের হাতে উন্নতমানের বিভিন্ন হাইব্রিড ও উফশী জাতের শাকসবজির বীজ এবং প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার তুলে দিয়ে কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। একই সঙ্গে উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে কৃষক কার্ডের তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রমেরও উদ্বোধন করা হয়।এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক চৌধুরী, জেলা বিএনপির অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক রবিউল আলম তুহিন, গোয়ালডিহি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাখাওয়াত হোসেন লিটন, বিএনপি নেতা শরিফুল ইসলাম প্রধান, উপজেলা বিএনপির সদস্য সাঈয়েদ আহমেদ সেলিম বুলবুল, ভেড়ভেড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম বাবুল, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আগত কৃষকরা।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের উন্নতমানের হাইব্রিড ও উফশী জাতের শাকসবজির বীজ এবং প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ ও সেচসুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, সরকারি ভর্তুকি ও কৃষি প্রণোদনা, কৃষি বীমা, স্বল্পমূল্যে কৃষিযন্ত্র সংগ্রহ এবং ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিপণনের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বাজারদর, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, কৃষি প্রশিক্ষণ ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্পর্কিত তথ্যও সহজে জানতে পারবেন।অনুষ্ঠানে উপস্থিত কৃষকরা সরকারের এ উদ্যোগকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে বলেন, কৃষক কার্ড চালু হলে প্রকৃত কৃষক সহজেই সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাবেন এবং বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, পর্যায়ক্রমে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে কৃষক কার্ডের তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। পাশাপাশি কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচিও অব্যাহত থাকবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি খাতকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

শিল্পসেবার বিস্তারেও গ্রামীণ অর্থনীতি এখনো কৃষিনির্ভর

দেশে শিল্পায়নের প্রসার, উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণ এবং সেবা খাতের দ্রুত বিকাশের পরও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি এখনো কৃষি। খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, গ্রামীণ মানুষের আয় এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই কৃষিকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত ‘কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ-২০২৬’-এ সেই বাস্তবতাই নতুন করে উঠে এসেছে। বর্ষগ্রন্থ অনুযায়ী, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান বর্তমানে ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ। এ খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৮ লাখ ৭০ হাজার। ফলে শিল্প ও সেবা খাতের অবদান বাড়লেও দেশের অন্যতম বৃহৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হিসেবে কৃষি এখনো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রবাহ সচল রাখতে কৃষির ভূমিকা অপরিহার্য। বিবিএসের এ প্রকাশনায় দেশের কৃষি খাতের একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন, আবাদি জমি, ফলন, মৎস্য, গবাদিপশু, বন, ভূমি ব্যবহার, কৃষি উপকরণ, আবহাওয়া এবং কৃষিপণ্যের আমদানি-রপ্তানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য সংযোজন করা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং কার্যকর কৃষিনীতি প্রণয়নে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষগ্রন্থে দেশের ১৪৬টি প্রধান ও অপ্রধান ফসলের আবাদ, উৎপাদন ও ফলনের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে আউশ, আমন, বোরো, গম, আলু ও পাটের সর্বশেষ দুই বছরের এবং আরও ১৪০টি অপ্রধান ফসলের তিন বছরের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ফসলের ক্ষয়ক্ষতি, কৃষিশ্রমিকের মজুরি, সেচ, বীজ ও সার ব্যবহারের তথ্যও সংযোজন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের কৃষি উৎপাদন মূলত খরিফ ও রবি—এই দুই মৌসুম ঘিরে আবর্তিত হয়। খরিফ মৌসুমে ধানসহ বর্ষাভিত্তিক ফসল এবং রবি মৌসুমে গম, আলু, ডাল ও তেলবীজসহ শীতকালীন ফসল উৎপাদিত হয়। দেশের খাদ্য উৎপাদন ও কৃষি অর্থনীতিতে এই দুই মৌসুমের অবদানই সবচেয়ে বেশি। ফসল উৎপাদনের হিসাব নির্ধারণে বিবিএস মাঠপর্যায়ের সরাসরি পর্যবেক্ষণ এবং কৃষকের সাক্ষাৎকার—উভয় পদ্ধতির তথ্য ব্যবহার করেছে। প্রধান ফসলের ক্ষেত্রে দুটি উৎসের তথ্য মিলিয়ে চূড়ান্ত উৎপাদনের হিসাব নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে নিয়মিত নমুনা জরিপ ও কৃষি শুমারির তথ্যও এতে যুক্ত করা হয়েছে। প্রকাশনায় দেশের ৩০টি কৃষি-বাস্তুতান্ত্রিক অঞ্চলের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। মাটির ধরন, ভূপ্রকৃতি ও কৃষি সম্ভাবনার ভিত্তিতে এসব অঞ্চল নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বন্যার ঝুঁকি বিবেচনায় জমিকে পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে, যাতে অঞ্চলভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা ও উপযোগী ফসল নির্বাচন সহজ হয়। বিবিএসের সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মদ ওবায়দুল ইসলাম বলেন, কৃষি খাতের উন্নয়ন মূল্যায়ন এবং তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার জন্য সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান অপরিহার্য। যদিও বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সময়মতো পাওয়া সব সময় সম্ভব হয় না, তবুও সেগুলো পুনর্গঠন করে প্রকাশনায় অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা করা হয়। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মিজানুর রহমান বলেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় কৃষি খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তাই খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও সুস্পষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।

শিল্পসেবার বিস্তারেও গ্রামীণ অর্থনীতি এখনো কৃষিনির্ভর